বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১২:৩৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনে প্রকৌশল ভাবনার স্বরূপ

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক, যাঁর চিন্তাধারা ও কর্মপরিকল্পনায় বাস্তবতা ও কার্যকারিতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। যদিও তিনি পেশাগতভাবে একজন প্রকৌশলী ছিলেন না, তথাপি তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন দর্শনে প্রকৌশলগত চিন্তাভাবনার গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল নীতিগত ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং কার্যকর ও টেকসই অবকাঠামো গঠনের মধ্য দিয়েই সম্ভব। এ কারণেই তাঁর শাসনামলে সড়ক, সেতু, বাঁধ, সেচব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর দৃষ্টিতে এসব অবকাঠামো ছিল জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড, যা ছাড়া কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

আজ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৯০তম জন্মবার্ষিকী | ইনসাফ

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক

একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমান পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল সক্ষমতা ব্যবহারের যে প্রয়াস দেখা যায়, তা তাঁর বাস্তববাদী ও কার্যকর রাষ্ট্রচিন্তারই বহিঃপ্রকাশ।

তিনি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ে দেশীয় সম্পদ ও স্থানীয় প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর জোর দেন। বিদেশি সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব দক্ষতা ও কারিগরি জ্ঞানের বিকাশে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক কালের টেকসই উন্নয়ন ও উপযোগী প্রযুক্তি ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রকৌশলকে কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং জাতি গঠন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর উন্নয়ন দর্শনে নিহিত এই প্রকৌশল ভাবনা আজও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

জিয়াউর রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি বক্তৃতার অলংকারে নয়, বরং ইট–পাথর, লোহা–কংক্রিট ও মানুষের শ্রমে নির্মিত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই তাঁর শাসনামলে সড়ক ও সেতু, বাঁধ ও সেচব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল প্রশাসনিক কর্মসূচি ছিল না—ছিল একটি জাতিকে দাঁড় করানোর সুদূরপ্রসারী প্রয়াস। তাঁর দৃষ্টিতে এসব অবকাঠামো ছিল জাতীয় জীবনের মেরুদণ্ড, যার ওপর ভর করেই কৃষির শস্য, শিল্পের চাকা এবং বাণিজ্যের স্রোত এগিয়ে চলে।

একজন সৈনিক হিসেবে তিনি জানতেন—পরিকল্পনা ছাড়া সাফল্য আসে না, শৃঙ্খলা ছাড়া কাঠামো দাঁড়ায় না, আর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়া উন্নয়ন স্থায়ী হয় না। দুর্যোগের মুহূর্তে, কিংবা ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে নির্মাণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল সক্ষমতা কাজে লাগানোর মধ্যে তাঁর সেই বাস্তববাদী রাষ্ট্রচিন্তারই প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়।

স্বনির্ভরতার দর্শন ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। দেশীয় সম্পদ, স্থানীয় মেধা ও নিজস্ব প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে তিনি চেয়েছিলেন এক আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র নির্মাণ করতে—যে রাষ্ট্র কেবল সাহায্যপ্রার্থী নয়, বরং নিজের প্রয়োজন নিজেই পূরণে সক্ষম। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের ভাষায় টেকসই উন্নয়ন ও উপযোগী প্রযুক্তির দর্শনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত।

অতএব বলা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রকৌশলকে কেবল যন্ত্র ও নির্মাণের বিদ্যা হিসেবে দেখেননি; তিনি দেখেছিলেন এটিকে জাতি গঠনের নীরব অথচ শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর উন্নয়ন দর্শনে নিহিত এই প্রকৌশল ভাবনা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ প্রযুক্তি এবং মানুষের শ্রম ও স্বপ্নের সম্মিলনে।

১) বাস্তববাদী ও প্রয়োগমুখী উন্নয়ন দর্শন

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে উন্নয়ন হতে হবে মাঠভিত্তিক ও বাস্তব সমস্যার সমাধানমূলক। সড়ক, সেতু, সেচব্যবস্থা, বাঁধ, বিদ্যুৎ—এসব অবকাঠামোকে তিনি অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে দেখতেন। এটি প্রকৌশল চিন্তার একটি মৌলিক দিক: সমস্যা শনাক্ত → কার্যকর সমাধান → দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।

২) অবকাঠামোকে জাতীয় শক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখা তাঁর শাসনামলে-

৥ গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন

৥ কৃষিতে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা

৥ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীশাসন এসব খাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো প্রকৌশল ছাড়া সম্ভব নয়, এবং তিনি প্রকৌশলকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন।

৩) সেনাবাহিনীর প্রকৌশল দক্ষতার ব্যবহার

একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি জানতেন-

৥ পরিকল্পনা

৥ শৃঙ্খলা টেকনিক্যাল দক্ষতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ মোকাবিলা ও অবকাঠামো পুনর্গঠনে সেনাবাহিনীর (বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার কোরের) দক্ষতা কাজে লাগানোর প্রবণতা তাঁর চিন্তায় ছিল।

৪) স্বনির্ভরতা ও স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার

জিয়াউর রহমান “স্বনির্ভর বাংলাদেশ”-এর কথা বলতেন। প্রকৌশল দৃষ্টিতে এর অর্থ—

৥ স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার

৥ দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন

৥ বিদেশ নির্ভরতা কমানো, এই ধারণা আজকের ভাষায় appropriate technology বা sustainable engineering-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৫) মানবসম্পদ ও কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব

তিনি মনে করতেন, কেবল আমলাতন্ত্র নয়— কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষ জনশক্তি তৈরি না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। এ কারণে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার চিন্তা তাঁর নীতিতে প্রতিফলিত হয়। জিয়াউর রহমানের প্রকৌশল ভাবনা ছিল মূলত-

৥ তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবভিত্তিক

৥ উন্নয়নমুখী ও জাতীয় প্রয়োজনকেন্দ্রিক

৥ স্বনির্ভরতা ও টেকসই অবকাঠামোতে বিশ্বাসী

তিনি প্রকৌশলকে দেখতেন রাষ্ট্র গঠনের নীরব কিন্তু শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উন্নয়নকে কাগুজে পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রয়োগের ওপর জোর দেন। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য তিনি সড়ক, সেতু, বাঁধ, সেচব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ খাতের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁর দৃষ্টিতে, শক্ত অবকাঠামো ছাড়া কৃষি, শিল্প কিংবা বাণিজ্যের টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়—এটি একটি স্পষ্ট প্রকৌশলধর্মী উপলব্ধি।

তিনি পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার গুরুত্ব ভালোভাবে অনুধাবন করতেন। দুর্যোগ মোকাবিলা, পুনর্গঠন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল সক্ষমতা ব্যবহারের প্রবণতা তাঁর চিন্তারই প্রতিফলন। জিয়াউর রহমান স্বনির্ভরতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। দেশীয় সম্পদ ব্যবহার, স্থানীয় প্রযুক্তির বিকাশ এবং বিদেশি নির্ভরতা কমানোর যে দর্শন তিনি তুলে ধরেন, তা আধুনিক প্রকৌশল ধারণা—যেমন টেকসই উন্নয়ন ও উপযোগী প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রকৌশলকে কেবল প্রযুক্তি হিসেবে নয়, বরং জাতি গঠন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি মৌলিক হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর উন্নয়ন দর্শনে এই প্রকৌশলগত বাস্তবতা আজও প্রাসঙ্গিক।

 

লেখক : প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page

প্রযুক্তি সহায়তায় রায়তাহোস্ট